দাওয়াতি মিশনে স্ত্রীর ভূমিকা : সীরাত ও সমসাময়িক বাস্তবতা
দাওয়াহ ইলাল্লাহ ইসলামের প্রাণস্বরূপ একটি দায়িত্ব। এটি কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা পেশার মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রতিটি ঈমানদারের ওপর তার সামর্থ্য অনুযায়ী ফরজ দায়িত্ব। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—দাওয়াতের এই দায়িত্ব কখনোই একক প্রচেষ্টায় সফল হয় না। এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, ত্যাগ, দৃঢ়তা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে পারস্পরিক সহযোগিতা।
একজন দাঈ যখন সমাজের বিরোধিতা, আত্মীয়দের তিরস্কার, অর্থনৈতিক সংকট ও মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হন, তখন তার সবচেয়ে নিকটবর্তী আশ্রয়স্থল হয় তার পরিবার। আর সেই পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু হলেন তার স্ত্রী। স্ত্রী চাইলে দাওয়াতের পথে শক্তি হয়ে উঠতে পারেন, অনুপ্রেরণা ও চালিকাশক্তি হতে পারেন; আবার অসচেতন হলে তিনিই দাওয়াতি পথচলার দুর্বলতার কারণ কিংবা বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র সীরাত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়—দাওয়াতি মিশনে স্ত্রীদের ভূমিকা কখনোই গৌণ বা আনুষঙ্গিক ছিল না; বরং তা ছিল সময়োপযোগী ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই প্রবন্ধে আমরা সীরাতের আলোকে বিশ্লেষণ করব—কীভাবে স্ত্রী একজন দাঈর সবচেয়ে বড় সহযোগী হয়ে উঠতে পারেন এবং বর্তমান সময়ে এর বাস্তব শিক্ষা কী।
সীরাতের আয়নায় স্ত্রীর দাওয়াতি ভূমিকা
এক. হযরত খাদিজা রা. : দাওয়াতের প্রথম আশ্রয়
ইসলামের দাওয়াতের সূচনা কোনো মসজিদে বা মিম্বরে হয়নি; বরং শুরু হয়েছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিজ ঘর থেকে। হেরা গুহা থেকে ফিরে এসে অস্থির ও স্পন্দিত চিত্তে যখন তিনি বলছিলেন—“আমাকে ঢেকে দাও, আমাকে ঢেকে দাও”—তখন যিনি দৃঢ়তার সঙ্গে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি হলেন হযরত খাদিজা রা.।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সঙ্গে হেরা গুহার পূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করলে খাদিজা রা. শুধু সান্ত্বনাই দেননি; বরং দৃঢ় কণ্ঠে তাঁর সত্যতার সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন— “কখনোই না! আল্লাহ আপনাকে অপমান করবেন না। আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখেন, দুর্বলদের বোঝা বহন করেন, নিঃস্বকে সাহায্য করেন, অতিথির সম্মান করেন এবং সত্যের পথে আসা বিপদে মানুষকে সহায়তা করেন।”
(সীরাত ইবনে হিশাম, ১ম খণ্ড; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৯৫)
খাদিজা রা. ছিলেন ইসলামের প্রথম ঈমানদার নারী। তিনি নিজের সমস্ত সম্পদ দাওয়াতের জন্য উৎসর্গ করেন। শিআবে আবি তালিবের কঠিন অবরোধ, অনাহার, সামাজিক বয়কট ও নিঃসঙ্গতার সময়েও তিনি কখনো নবীজিকে দাওয়াত থেকে সরে আসতে বলেননি। বরং শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত দাওয়াতের পথে তাঁর পাশে থেকেছেন।খাদিজা রা. প্রমাণ করেছেন—স্ত্রী কেবল ঘরের দেখাশোনাকারী নন; বরং তিনি হতে পারেন দাওয়াতের অন্যতম স্তম্ভ ও শক্তিশালী সহযোগী।
দুই. উম্মে সালামা রা. : সংকটে প্রজ্ঞা ও দূরদর্শী পরামর্শ
হুদাইবিয়ার সন্ধির পর নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কিরাম রা.-কে আদেশ করলেন—“ওঠো, কুরবানি করো এবং মাথা মুন্ডন করো।” তিনি এই আদেশ তিনবার দিলেন; কিন্তু গভীর মানসিক ব্যথা ও চুক্তির রেশে সাহাবিরা নীরব হয়ে বসে থাকলেন। কেননা আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছিল—সব শর্ত কাফিরদের পক্ষে গেছে।
এই কঠিন মুহূর্তে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রী উম্মে সালামা রা.-এর কাছে পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ পরামর্শ দেন— “ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি বাইরে যান, কারও সঙ্গে কথা না বলে নিজেই কুরবানি করুন এবং মাথা মুন্ডন করুন।" নবীজি ঠিক তাই করলেন। সাহাবায়ে কিরাম রা. যখন নবীজিকে আমল করতে দেখলেন, তখন তারা সবাই একে একে উঠে একই কাজ করলেন।
(ফিকহুস সীরাহ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৯৭)
এই ঘটনা স্পষ্ট করে দেয়—স্ত্রী শুধু আবেগের সঙ্গী নন; বরং তিনি দাওয়াতি সংকটে দূরদর্শী পরামর্শদাতা ও সিদ্ধান্তের সহায়ক হতে পারেন।
বর্তমান সময়ে সীরাতের এই শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা
আজকের দাওয়াতি বাস্তবতা আরও জটিল ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ। সামাজিক চাপ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মিডিয়ার প্রভাব, ইসলামবিদ্বেষ ও পারিবারিক টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে একজন দাঈর পথ কঠিন হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় স্ত্রীর সহযোগিতা না থাকলে— দাওয়াতি ক্লান্তি দ্রুত আসে, পরিবার ও দাওয়াতের মাঝে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, দাঈ মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারেন।
অন্যদিকে, যদি স্ত্রী দাওয়াতের উদ্দেশ্য বোঝেন, স্বামীর সময় ও ত্যাগকে সম্মান করেন এবং নিজেও দাওয়াতি কাজে অংশ নেন—তবে সেই পরিবার হয়ে ওঠে নববি পরিবারের প্রতিচ্ছবি। আজকের সময়ে স্ত্রী পারেন—নতুন মুসলিম বোনদের পাশে দাঁড়াতে, নারীদের মাঝে দ্বীনি শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে, দাওয়াতি প্রতিষ্ঠানের নেপথ্য শক্তি হতে,স্বামীকে মানসিক প্রশান্তি ও স্থিরতা দিতে।
আমাদের জন্য সীরাতের শিক্ষাসমূহ
১. দাওয়াতি জীবনসঙ্গী নির্বাচন অপরিহার্য।
কারন বিয়ে শুধু ব্যক্তিগত সুখের বিষয় নয়; এটি দাওয়াতের অংশীদারিত্ব।
২. স্ত্রীকে বোঝা নয়, দাওয়াতের শরিক ভাবতে হবে। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন—এটি আমাদের জন্য সুন্নাহ।
৩. নারীদের দাওয়াতি ভূমিকা অবহেলা করা যাবে না। সীরাত প্রমাণ করে—নারীর অবদান ছাড়া দাওয়াত অসম্পূর্ণ।
৪. দাওয়াত ঘর থেকেই শুরু হয়। তাই যে ঘর দ্বীনের আলোয় আলোকিত, সেখান থেকেই সমাজ আলোকিত হয়।
নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সীরাত আমাদের স্পষ্ট করে শেখায়—দাওয়াতের পথে স্ত্রী কোনো প্রতিবন্ধক নন; বরং তিনি হতে পারেন সবচেয়ে বড় শক্তি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—খাদিজা রা. না থাকলে দাওয়াতের সূচনা এত দৃঢ় হতো না, আয়েশা রা. না থাকলে উম্মাহ এত জ্ঞানসমৃদ্ধ হতো না। আজ যারা দাওয়াতের ময়দানে কাজ করছেন বা করতে চান, তাদের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট—একটি দাওয়াতি পরিবার গড়ুন, যেখানে স্ত্রী হবেন সহযোদ্ধা, বোঝা নয়। এভাবেই সীরাতের আলোকে আমাদের দাওয়াতি যাত্রা হবে সুদৃঢ়, বরকতময় ও ফলপ্রসূ—ইনশাআল্লাহ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন